স্যার ক্লাসে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল প্রত্যেকে নিজের বাড়ির আশেপাশে ঘটে যাওয়া চর্মরোগ-সম্পর্কিত কয়েকটা ঘটনা লিখে আনবে।’ আমি অনেক চেষ্টা করে এক পৃষ্ঠা লিখেছিলাম। যদিও আমি না লিখলেও তেমন কোনো শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ, স্যার বলেই দিয়েছিলেন যে, কারও লেখা না দেখলেও হাফপ্যান্টের লেখা দেখবেন এবং ক্লাসের সবার সামনে পড়ে শুনাবেন।

আমি হাফপ্যান্টকে বলেছিলাম, ‘তুই তো কোনোদিনই ঠিকমতো বাড়ির কাজ করতে পারিস না। স্যার আম লিখতে বললে জাম লিখে নিয়ে আসিস। প্রতি বছর তোকে উপরের ক্লাসে উঠাতে গেলে তোর বাবাকে হেডস্যারের পায়ে পড়তে হয়। তুই এক কাজ কর, আমার লেখা দেখে দেখে লিখে নে!’

হাফপ্যান্ট এক কথায় জবাব দিয়েছিল, ‘আমার লেখা শেষ। কাল ক্লাসে দেখবি সবাই আমার লেখা পড়ে হাত তালি দেবে।’

আমি মনে মনে বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, তাও ঠিক। চার বছরে প্রথমবার তুই বাড়ির কাজ করবি। অবশ্যই সবাই হাত তালি দেবে।’

আজ ক্লাসে আসলাম। প্রতিদিনের মতোই সামনের বেঞ্চে বসে আছি। তৃতীয় পিরিয়ডে স্যার ক্লাসে এসেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাফপ্যান্ট, বাড়ির কাজ করেছিস?’

‘জি স্যার, করেছি।’

হাফপ্যান্টের এমন জবাব শুনে সবাই অবাক। চার বছরে প্রথমবার সে বাড়ির কাজ করেছে। এখন যদি এক লাইনও লিখে আনে, স্কুলে নতুন ইতিহাস হয়ে যাবে।

‘কোথায় তোর বাড়ির কাজ? দেখি!’

স্যার হাফপ্যান্টের কাছ থেকে ওর খাতাটা নিয়ে দেখলেন, চর্মরোগ শিরোনামের পর ৪-৫টা পৃষ্ঠা লেখা। স্যার আরও অবাক হলেন । বললেন, ‘হাফপ্যান্ট, সত্যি করে বল- কার খাতা দেখে লেখেছিস?’

‘সত্যি স্যার, কারও থেকে দেখিনি।’

‘ঠিক আছে। আয়, তুই নিজেই পড়ে শোনা কী লিখেছিস।’

হাফপ্যান্ট বুক ফুলিয়ে সামনে গিয়ে স্যারের হাত থেকে খাতাটা নিয়ে বলল—

‘আমি মুহাম্মদ তরিকুল। সবার পরিচিত ‘হাফপ্যান্ট’। চর্মরোগ নিয়ে আমি কিছু কথা লিখেছি। এখন তা পাঠ করছি।’

কথাটা শুনে সবাই হাসতে লাগল। একজন বলল, ‘হাফপ্যান্টটা আর বড় হবে না। ওই হাফপ্যান্ট পরার মতো বয়সেই থেকে যাবে!’

এসব কথায় কান না দিয়ে পড়া শুরু করল সে।

“চর্মরোগ”

‘আমার পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে, চুলকানি জাতীয় রোগকে চর্মরোগ বলে। চর্মরোগ আমাদের জন্য অনেক ক্ষতিকর। একদিন মায়ের সামনে মতি কাকার বউ মতি কাকার ছোট ভাইয়ের বউকে নিয়ে অনেক কথা বলেছিল। পরে আমিও মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করলাম, “মা, মতি কাকার বউ তোমার কাছে তার জাকে নিয়ে এত কথা কেন বলল?” মা বলেছিল, “উনি এরকমই। কারও সমালোচনা করতে না পারলে উনার চুলকানি হয়।” তখন বুঝলাম মতি কাকার বউয়ের চুলকানি মানে চর্মরোগ আছে।’

হাফপ্যান্টের এসব কথা শুনে আমাদের মাথায় হাত। হাফপ্যান্ট এসব কী লিখেছে! অন্যদিকে স্যার তো তার চেয়ারে বসতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন। ও কী পড়ছে কিছু শুনতেই পারছেন না, আমরাও বলতে পারছি না যে, ও ভুলভাল লিখেছে। কিছু করার নেই। স্যার ঘুম থেকে জেগে ওঠা পর্যন্ত সব মুখ বুঝে শুনতে হবে। তাই পড়ার দিকে খেয়াল করলাম আবার।

ও পড়ছে…

‘গ্রামের অনেকেরই চর্মরোগ রয়েছে। কারও চর্মরোগের কথা সবাই জানে। কারও চর্মরোগের কথা অজ্ঞাত। কিছুদিন আগের ঘটনা। মানিক ভাই নতুন বিয়ে করে বউ রেখে বিদেশে গিয়েছে। কয়েক বছর পর বাড়ি ফিরে সে। এরপর চর্মরোগের রোগীদের কাছে অর্থাৎ যাদের চুলকানি আছে তাদের কাছে শুনতে পায়, তার বউ তার আয় করা টাকা দিয়ে বাপের বাড়ির মানুষকে খাওয়ায়। তারপর থেকে বউটাকে মানিক ভাই মারধর করতে করতে তাড়িয়ে দেয়। অন্য লোকের চর্মরোগ বা চুলকানির কারণে মানিক ভাইয়ের বউ হয় ঘরছাড়া আর মানিক ভাইয়ের মেয়ে হয় মা হারা।

একইরকম চুলকানি বা চর্মরোগের রোগীদের কারণে মুন্সীবাড়ির বড় ছেলে আর ভুঁইয়া বাড়ির একমাত্র ছেলে গতবার মারামারি করে জেলে গিয়েছে। পাশের গ্রামের কলেজে রহিম চাষীর ছেলে মফস্বলের কোচিংয়ে প্রতিদিন পড়তে যেত। কিন্তু ওই একদল চর্মরোগী নতুন রটনা রটিয়ে দিল যে, রহিম চাষীর ছেলে মফস্বলে পড়তে গিয়ে ওই গ্রামের মাতুব্বরের মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে। শেষে মাতুব্বর ছেলেটার পড়ালেখা বন্ধ করিয়ে দিল। রহিম চাষীর জমিও কেড়ে নিল । দুইদিন পরে শোনা গেল, চর্মরোগীর চুলকানির কারণে রটিয়ে দেওয়া কথায় রহিম চাষীর পুরো পরিবার গলায় দড়ি দিয়েছে।

এই চর্মরোগ একটি ছোঁয়াছে রোগ, যা মূলত আমাদের আলীর চায়ের দোকানে বসে থাকা কিছু চুলকানিওয়ালা মানুষের সঙ্গে গেলেই হয়। ইহা একটি ভয়ঙ্কর রোগ, যা মানুষের সংসার ভাঙতে পারে, মেয়েকে মায়েদের থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে, কাউকে জেলে পাঠিয়ে দিতে পারে। আবার পুরো পরিবারের গলায় দড়িও তুলে দিতে পারে। চর্মরোগীদের থেকে আমাদের সাবধান থাকা উচিৎ। আমাদের যাতে চর্মরোগ না হয়, তাই আমাদের চর্মরোগীদের থেকে দূরে থাকা উচিৎ।’

হাফপ্যান্টের পড়া শুনে আমারা সবাই হা হয়ে গেছি। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তখনই ঘণ্টা বেজে গেল। স্যারের ঘুম ভেঙে গেল। উনি লাফ দিয়ে উঠে বললেন, ‘বাহ্ হাফপ্যান্ট, ভালো লিখেছিস। এই ওর জন্য জোরে তালি দাও সবাই। হাফপ্যান্ট, কাল জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে লিখবি!’

এই বলে স্যার ক্লাস ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি যদি শুনতেন হাফপ্যান্ট চর্মরোগ নিয়ে কী লিখেছে, তাহলে হয়তো জলাতঙ্ক নিয়ে লিখতে বলতেন না। কিন্তু কে জানে, কাল আবার হাফপ্যান্ট কী লিখে আনে!

[ষোলো ম্যাগাজিনের ষষ্ঠ (মে-জুলাই ২০২৪) সংখ্যায় প্রকাশিত]